ঢাকা, ৩০শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ৮ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম ও তার পরিবার


প্রকাশিত: ৩:৫৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

প্রতিনিধি:

প্রয়াত ইব্রাহিম খলিল এর পুত্র মো: আবুল কাশেম খাগড়াছড়ি সদর শালবন ৬ নং পৌর এলাকার বাসিন্দা। ১৯৭০ ইং সনে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে কাজ করেছেন।১৯৭১ সালে তার মামার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার বাদলা ইউপির শিমলা বর্শিকুড়া ওয়ার্ড ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৫ ইং সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার সপরিবারে হত্যার পর আবুল কাশেম গা- ঢাকা দিয়ে সুনামগঞ্জ জেলার তাহের পুর থানার বাতাঘাট ইউনিয়ন জয়বাংলা বাজারের পাশে লাউড়েরগড় গ্রামে প্রায় ১৪ বছর অতিবাহিত করেন। ১৯৮৮ইং সনে খাগড়াছড়ি জেলা সদর শালবন গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাঙ্গালী কৃষক শ্রমিক কল্যাণ পরিষদ, যৌথ আত্মমানব কল্যাণ পরিষদ, ভূমিহীন সমবায় সমিতিসহ অসংখ্য সামাজিক সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা খাগড়াছড়ি জেলা যুব কমান্ডের যুগ্ন আহবায়ক ছিলেন। ৯০ এর দশক থেকে খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সকল কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহন শুরু হয়।
১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তির প্রাক্কালে বিএনপি জামাত ৪ দলীয় জোট শান্তিচুক্তি বিরোধী দূর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। তখন অসংখ্য আওয়ামী নেতাকর্মী নিরব ভুমিকা পালন করে। খাগড়াছড়ি জেলা সদর শালবন এলাকায় আবুল কাশেম অপরাপর আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে তাদের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে শান্তিচুক্তির পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় অংশ গ্রহন করলে শান্তিচুক্তি বিরোধীরা প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়। তখন সারা জেলা থেকে বিএনপি জামাত জোটের সহস্রাধিক সন্ত্রাসী শহরে এসে ওঁৎপেতে থাকে আওয়ামী নেতাকর্মীদের উপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। ১৯৯৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশে শতাধিক আওয়ামী কর্মী সমর্থক নিয়ে শান্তিচুক্তির পক্ষে প্রচার-প্রচারনা চালানোর জন্য মিটিং-এর আয়োজন করা হয়। তখন শহরে ওঁৎপেতে থাকা সন্ত্রাসীরা ছুরি,কিরিস,রামদাসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে শালবন গ্রামের আওয়ামী নেতাকর্মীদের উপর আক্রমণ করে। ফলে ১৩জন আওয়ামী নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়ে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়।
আহত নেতাকর্মীদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তৎক্ষণিক চিকিৎসার কারণে গুরুতর আহতরা প্রাণে বেঁচে গেলেও কিছুদিনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তাদের মধ্যে থেকে ৫জন অকালে মৃত্যু বরন করেন। যেমন: মো: নুরুল ইসলাম, মন্তু মিয়া, মেনু মিয়া, হুমায়ুন কবির,ও নুর উদ্দিন। পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে মো: সাহেব আলী ও মো: মোন্তাজ আলী। আহতদের সকলেই শালবন গ্রামের এবং আবুল কাশেমের আত্মীয়-স্বজন। সে সময় অত্র এলাকায় রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকান্ডে ৯০ শতাংশ লোক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো । খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের মিছিল মিটিং থেকে শুরু করে প্রতিটি কর্মকান্ডে শালবন এলাকার আওয়ামী নেতাকর্মী অংশগ্রহণ না করিলে জেলা আওয়ামী লীগের ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে বের হওয়া সম্ভব হতো না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট ক্ষমতায় এলে সারা দেশের ন্যায় শালবন গ্রামের আওয়ামী নেতাকর্মীদের উপরও নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। মারপিট, হত্যা, ধর্ষণ, লাঞ্চনা, কৌশলে অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে এমন কোন অপকর্ম নেই যে, তাদের দ্বারা সংঘঠিত হয়নি। আবুল কাশেমের স্ত্রী জাহেদা বেগম জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্যা। ২০০৩ইং সালে আবুল কাশেমের স্ত্রী-সন্তানদেরকে গুরুতর রক্তাত্ব জখম করে রাস্তায় ফেলে রাখে বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীরা। আবুল কাশেমের ছোট ভাই প্রয়াত আবুল কালাম ওয়ার্ড আওয়ামী শ্রমিক লীগের সাধারন সম্পাদক ছিলেন।

আবুল কাশেম ও তার ভাই আবুল কালাম, নুর হোসেন চৌধুরী, মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, আব্দুর রশিদ, ইসলাম উদ্দিন, নুর উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন, শামছু মাঝি, নজরুল ইসলামসহ অসংখ্য আওয়ামী নেতাকর্মীকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করে তাদের সহায় সম্পদ লুন্ঠণ করে বিএরপির সন্ত্রাসীরা। সন্তান সন্ততিদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করা হয়। আবুল কাশেমের ৪ ভগ্নিপতি-মো: সাহেব আলী, জিন্নত আলী, মন্তু মিয়া ও মন্তাজ আলীসহ আরো অনেক আওয়ামী কর্মী সমর্থককে শারিরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। অর্থাৎ যে সকল আওয়ামী নেতাকর্মীর আত্মীয়-স্বজন শালবন গ্রামে ছিল, তাহারা প্রত্যেকেই হামলা-মামলা সহ শারিরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
অতপর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ হাজতে থাকতে হয় আবুল কাশেমকে। তার বড় ছেলে আলামিন যুবলীগের কর্মী ছিলো। ২০১০ইং সালে সে অকালে মৃত্যু বরন করে। আলামিনের দুটি সন্তানের লেখা পড়া থেকে শুরু করে সকল দায়িত্ব দাদা আবুল কাশেমের উপর। ভিলেজ পলিটিক্সের কারণে আবুল কাশেমের ছোট মেয়ে কারিমুন্নাহার রুনা ২টি কন্যা সন্তান নিয়ে ৯ বছর যাবৎ স্বামী পরিত্যাক্তা হিসেবে অতি কষ্টে দিন যাপন করছে। আবুল কাশেমের ২ পুত্র সন্তানের দিন মজুরীর আয় দিয়ে কোন রকমে তাদের এ বিশাল সংসার পরিচালিত হচ্ছে।
শালবনে আবুল কাশেমের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে এবং তিনি ১টি কবরস্থান, ১টি মসজিদ, ১টি মাদ্রাসা ও ১টি প্রাইমারি স্কলের প্রতিষ্ঠাতা বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। আবুল কাশেম দীর্ঘদিন যাবৎ ওয়ার্ড, পৌর, উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য দায়িত্বের পাশা-পাশি জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং পরবর্তীতে জেলা কৃষক লীগের আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার সন্তানের বয়স ৪২ বছর। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগে এমন লোকও রয়েছে, যাহারা আমার ছেলের বয়সের চেয়েও কম। তাহারা কোটি কোটি টাকার মালিক। সে সকল লোকের জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা আছে বলে মনে হয় না। তাহারা উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। কিন্ত আমার আর্থিকহীনতার কারনে দলের নিপীড়িত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও মিথ্যা মামলায় কারাবরণকারী এবং দলের জন্য সন্ত্রাসী কর্তৃক গুরুতর আহত হওয়ার পরেও আমার নামটি জেলা, উপজেলা বা পৌর কমিটিতে স্থান হয়নি’।

তথ্যে আরো জানা যায়, আবুল কাশেমের নিজ নামে খাগড়াছড়িতে কোন জায়গা সম্পদ নেই। সরকারি খাস জায়গায় একটি বসত বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। পার্বত্য জেলায় খাস জায়গার বন্দোবস্তি আইনিভাবে বন্ধ থাকার কারনে তার বসতবাড়ির জায়গাটি বন্দোবস্তি করে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আবুল কাশেম ২০০৮ সালে ২১ আগস্ট বিএনপি কর্তৃক মারাত্মকভাবে জখম হয় এবং তার স্ত্রী জাহেদা বেগম ২০০৩ সালে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার কারনে বর্তমানে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। সহায় সম্পদ যা ছিল, তা বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ চালিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছে পরিবারটি। আবুল কাশেম ও তার স্ত্রীর প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকার মতো ঔষধ খরচ লাগে। এই দু:সময়ে তাদের জীবনে কোন অঘটন ঘটলে তাদের সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে এই দু:শ্চিন্তায় অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে আবুল কাশেম ও তার পরিবার।