আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন

প্রকাশিত: ১০:০৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২২

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

খাগড়াছড়ি জেলা বিভিন্নস্থানে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে র্যালী ও নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার খাগড়াছড়ি জেলাধীন পানছড়ি, দীঘিনালা ও লক্ষ্মীছড়িতে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।‘হে নারী সমাজ, জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে গর্জে উঠুন’ এই আহ্বানে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে র‌্যালি ও সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)।

মঙ্গলবার (৮ই মার্চ)সকাল ১০টার সময় লোগাং করল্যাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গন থেকে একটি র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি বাবুরো পাড়া বাজারে এসে শেষ হয় এবং সেখানে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের পানছড়ি উপজেলা কমিটির সভাপতি মিনতি চাকমার সভাপতিত্বে ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী শিউলী ত্রিপুরার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) সংগঠক বিপুল চাকমা, পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান শান্তি জীবন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির আহ্বায়ক এন্টি চাকমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি)-এর পানছড়ি উপজেলা কমিটির সভাপতি তৃষ্ণাংকর চাকমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম পানছড়ি উপজেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস মঙ্গল চাকমা।

সমাবেশে সংগঠক বিপুল চাকমা বলেন, আজকের দিনটি নারীদের একটি লড়াই সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের দিন। নারীদের লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ সারা বিশ্বে এই দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। এই দিনটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের নারীদেরও আরো বেশি অধিকার সচেতন হতে হবে। জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নারীদেরকে গর্জে উঠতে হবে, লড়াই সংগ্রামে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে।

হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী এন্টি চাকমা বলেন, ১৯৯৬ সালে ১২ জুন লে. ফেরদৌস কর্তৃক কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার ২৬ বছরেও হয়নি। চিহ্নিত অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসকে আজও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। বিচারের নামে সরকার সময় ক্ষেপন করছে। একইভাবে বিচার হয়নি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যা ঘটনারও। তিনি এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সারাদেশে নারী নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান।
তিনি নারী নির্যাতনসহ সকল নিপীড়ন-নির্যাতন অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

উপজেলা চেয়ারম্যান শান্তি জীবন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। দেখা গেছে, প্রতিটি গণহত্যায় ও সাম্প্রাদায়িক হামলায় নারীরাই সব চাইতে বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নারীরা নির্যাতন-ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু সরকার নারীদের সুরক্ষা দিতে পারছে না। তাই নারীদেরকে নিজেদের সুরক্ষা ও অধিকার অর্জনের জন্য আন্দোলন করতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন।

তৃষ্ণাংকর চাকমা বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের কোন নিরাপত্তা নেই। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নারী নির্যাতনসহ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

এস মঙ্গল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু নারী নির্যাতন নয়, সেনা-সেটলার কর্তৃক জুম্মোদের ভুমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০১০ সালে সাজেকে ভুমি বেদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে লক্ষীবিজয় ও বুদ্ধপুতি চাকমাকে সেনাবাহিনী কর্তৃক গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমাদেরকে ভুমি বেদখল, নারী নির্যাতনসহ সকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।সভাপতির বক্তব্যে মিনতি চাকমা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ও নারীদের নিরাপত্তার দাবিতে সোচ্চার হওয়ার জন্য নারী সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

সমাবেশ থেকে বক্তারা ধর্ষণ-নির্যাতনসহ নারীর ওপর সকল সহিংসতা বন্ধ করা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহারপূর্বক সকল অন্যায় দমন-পীড়ন বন্ধ করে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

দীঘিনালা : হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় নারী সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন দীঘিনালা শাখা।

“অস্ত্রের মুখে অপহরণ, টহল-তল্লাশির নামে ধর্ষণ আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না” এই স্লোগানে এই অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রিতা চাকমা, দীঘিনালা উপজেলা সহ-সভাপতি মিনা চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের দীঘিনালা উপজেলা সভাপতি জ্ঞান প্রসাদ চাকমা ও পিসিপি’র দীঘিনালা উপজেলা সভাপতি অনন্ত চাকমা প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘আন্তজার্তিক নারী দিবস’ সারাবিশ্বে নারী অধিকার আদায়ের এক সংগ্রামের ইতিহাস। বিশ্বের প্রতিটি দেশে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। অপরদিকে ১৯৮৮ সালের ৮ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, অন্যায় অত্যাচার, নারী নির্যাতন, ভূমি বেদখলসহ অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে।
তারা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী ধর্ষণ-নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। আর ধর্ষণ-নিপীড়নকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শাসকগোষ্ঠি ও ক্ষমতাশালীরা। যার ফলে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয় না।

বক্তারা বলেন, শাসকগোষ্ঠি যতই দমন-পীড়ন, খুন, ধর্ষণ, অন্যায়-অবিচার জারি রাখুক না কেন আমাদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী নির্যাতনসহ সকল নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

সমাবেশ থেকে বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণসহ সকল রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ করা, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া এবং পার্বত চট্টগ্রামকে বেসামরিকীকরণ করে গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

লক্ষ্মীছড়ি : এইদিকে খাগড়াছড়ি জেলা লক্ষ্মীছড়িতে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় পৃথক দুই স্থানে নারী সমাবেশ করেছে হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)।

মঙ্গলবার( ৮ মার্চ) দুপুর ১২টার সময় হিল উইমেন্স ফেডারেশনের লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা শাখার উদ্যোগে সদর ইউনিয়ন ও দুল্যাতলী ইউনিয়ন এলাকায় উক্ত নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।সমাবেশের ব্যানারে শ্লোগান ছিল, ‘জাতীয় অস্তিত্ব নিশ্চিত না হলে নারী নিরাপত্তাহীন, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে’।

সদর ইউনিয়ন এলাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা শাখার আহ্বায়ক জয়ন্তী চাকমার সভাপতিত্বে ও সদস্য অপিনা চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি পাইচি মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সদস্য জেসি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি রিটন চাকমা প্রমুখ।

অপরদিকে দুল্যাতলি ইউনিয়ন এলাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশন লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা শাখার সদস্য জননী চাকমা সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কেমি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি রুপান্ত চাকমা।
op
সদর ইউনিয়ন এলাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে পাইচি মার্মা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে একদিকে নানা উছিলায় ভূমি বেদখল করে পাহাড়িদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র, অপরদিকে নারী নির্যাতনসহ অন্যায় দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। ফলে পাহাড়িদের জাতীয় অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। তাই অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমাদের আন্দোলন ছাড়া কোন পথ নেই। মনে রাখতে হবে, জাতির অস্তিত্ব রক্ষা না হলে নারী নির্যাতন, দমন-পীড়ন বন্ধ হবে না। একমাত্র পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা হলেই আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা এবং নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে। তাই আমাদেরকে আন্দোলনের মাধ্যমেই পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

জেসি চাকমা আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের কঠোর সংগ্রাম। এই সংগ্রাম থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে হিল উইমেন্স ফেডারেশন এমন এক কঠিন সময়ে গঠিত হয়েছিল, যে সময় দেশে স্বৈরশাসক এরশাদের সামরিক শাসন জারি ছিল। তারপরও হিল উইমেন্স ফেডারেশন পার্বত্য চগ্রামে নারী নির্যাতনসহ অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে এবং বর্তমানেও অবিচলভাবে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নারী সমাজকে এই সংগঠনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রাম জোরদার করতে হবে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধের দাবি জানান।

রিটন চাকমা বলেন, নারীদের শুধু ঘরে বসে থাকলে হবে না, রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে হবে।

দুল্যাতলি ইউনিয়ন এলাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে কেমি চাকমা বলেন, আমাদের নারীদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। এর থেকে মুক্তির জন্য আমাদের জুম্ম নারীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে।
রুপান্ত চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের উপর যে অত্যাচার নির্যাতন, নারীদের উপর যে ধর্ষণ হয়রানি তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

সদর ইউনিয়নের নারী সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয় শিলাছড়ি এলাকায়। সমাবেশের আগে যতিন্দ্র কার্বারী পাড়া থেকে মিছিল সহকারে শিলাছড়িতে এসে সেখানে সমাবেশ করেন। অপরদিকে দুল্যাতলী ইউনিয়নের বানরকাটা এলাকা থেকে মিছিল সহকারে এসে উপজেলা এলাকা প্রদক্ষিণ করে উপজেলা হাসপাতালের সামনে সমাবেশ করা হয়।