এন্টিবডি টেস্ট ছাড়া দেশে করোনা মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব

প্রকাশিত: 11:37 PM, June 21, 2020

বর্তমানে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ জন্য শুধুমাত্র মলিকুলার টেস্ট চালু আছে। এই পদ্ধতিতে রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে সার্স-করোনা-ভাইরাস-২ এর আরএনএ নির্ণয় করে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করা হয়।

এই মলিকুলার টেস্টটি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং এই টেস্টটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বায়োসেফটি ২+ ল্যাবরেটরি, দামী ও জটিল যন্ত্রপাতিসহ মলিকুলার এক্সপার্ট জনবল প্রয়োজন।

এসব বিবেচনায় কোভিড-১৯ শনাক্তকরনের জন্য শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ল্যাবরেটরি অনুমোদিত হওয়ায় টেস্টটি করা দুর্লভ এবং ব্যয়বহুল।

টেস্টের নমুনা দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে এলাকাভিত্তিক বুথের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি বা বুথগুলোর প্রত্যেকটি জায়গাতে মানুষের শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে সিজন চেঞ্জ হওয়ার জন্য যখন অনেকেরই ঠাণ্ডা জ্বরের মত লক্ষ্মণ দেখা দিচ্ছে যা কোভিড-১৯ এর লক্ষ্মণগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।

কিন্তু দ্বিধাদ্বন্দের জন্য অনেকেই টেস্ট করাতে যেতে চান না। কারণ সিজনাল জ্বর হলে নমুনা দিতে গিয়ে শারীরিক দূরত্ব রাখতে না পারলে উলটো বাসায় ভাইরাস নিয়ে আসার আশংকা রয়েছে।

আবার বুথ থেকে যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে তা থেকে টেস্টের রেজাল্ট পেতে ৩-৭ দিনের বেশি সময় লাগছে। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগের চিকিৎসা যদি লক্ষ্মণ প্রকাশের শুরুতেই প্রথম সপ্তাহের মধ্যে শুরু করা যায় তাহলে কোভিড-১৯ রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

সেক্ষেত্রে লক্ষ্মণ প্রকাশের পরপরই টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ আসলে সেই অনুযায়ী জটিলতা প্রতিরোধ নেওয়া যায়, যেমন রক্ত জমাট বাধা রোধে ব্লাড থিনার এবং সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন রোধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে রোগীদের জটিলতা কমানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব।

তাই টেস্ট সংক্রান্ত জটিলতায় টেস্ট না করিয়ে অনেকেই এখন সরাসরি চিকিৎসা পরামর্শের জন্য চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

বর্তমানে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আমি আমার অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ ‘ডা. বুশরা তানজীম হেল্প ডেস্ক’র মাধ্যমে মানুষকে সচেতনতায় কাজ করছি। পাশাপাশি ফিমেল ডেন্টাল সার্জনস অব বাংলাদেশ এবং ইডক্টরস নামক অনলাইন গ্রুপের সঙ্গেও কাজ করছি।

কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, করোনা টেস্টের জটিলতা মানুষের মনে ক্ষোভ ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে। তাই অনেকেই এখন টেস্ট করতে ইচ্ছুক নন।

অনেকেই আবার বাংলাদেশের কোথায় এন্টিবডি টেস্ট হয় তা জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যেকোনো মূল্যে তারা এন্টিবডি টেস্ট করতে চান।

সম্প্রতি একটি ঘটনার বর্ণনা করা যাক। ১৪ জুন সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটি অনলাইন গ্রুপের স্বেচ্ছাসেবী একজন ডাক্তারের প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এক পরিবারের ৭ জনের কোভিড-১৯ এর লক্ষ্মণ ছিল, তাদের মধ্যে ২ জনের টেস্ট পজিটিভ এসেছে।

কিন্তু বাকি ৫ জনের লক্ষ্মণ থাকা সত্বেও তারা টেস্ট করাননি। এরপর তারা বাসায় কোভিড-১৯ এর লক্ষ্মণভিত্তিক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং এখন তারা সুস্থ। ২১ দিন পর কোনো লক্ষ্মণ না থাকায় তারা প্লাজমা ডোনেট করতে আগ্রহী। তাই তারা জানতে চেয়েছেন, তারা কি প্লাজমা ডোনেট করতে পারবেন?

এই ঘটনাটি যদি একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা যায় তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, একই পরিবারে প্রথম ২ জনের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ টেস্টের জটিলতায় পরবর্তী ৫ জন লক্ষ্মণ প্রকাশের পর টেস্টই করাননি।

কিন্তু যদি এন্টিবডি টেস্ট বাংলাদেশে চালু থাকতো তাহলে সার্স-করোনা-ভাইরাস-২ এর ইম্যুনোগ্লোবিউলিন-এম নির্ণয়ের মাধ্যমে এই ৫ জনের একটিভ ইনফেকশন শনাক্ত করা সম্ভব হতো। এই এন্টিবডি টেস্ট তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং সহজেই যেকোনো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দিয়ে করানো সম্ভব।

তাই জনগণকে কোভিড-১৯ টেস্টের জন্য ভোগান্তির শিকার হতে হত না।

আবার এই ৫ জন যেহেতু সুস্থ হয়ে গেছেন। তাই তারা যদিওবা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন তবুও এখন এই সুস্থ অবস্থায় তাদের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নাই। তাই মলিকুলার টেস্টের মাধ্যমে আরএনএ পরীক্ষা করা হলে রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে।

তাই তারা কোভিড-১৯ না সাধারণ ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন নির্ণয় করার একমাত্র উপায় এখন এন্টিবডি টেস্ট। যদি সার্স-করোনাভাইরাস-২ এর ইম্যুনোগ্লোবিউলিন-জি এন্টিবডি পজিটিভ আসে তাহলে বোঝা যাবে এই ৫ জন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন।

আবার এই ৫ জন এখন প্লাজমা ডোনেট করতে আগ্রহী।

কিন্তু তারা যেহেতু টেস্ট করায়নি তাই তাদেরকে সন্দেহজনক কোভিড-১৯ রোগী ছিল বলে ধরে নিলেও নিশ্চিতভাবে তাদের শরীরে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে সার্স-করোনা-ভাইরাস-২ এর আছে কিনা সেটি বোঝা সম্ভব নয়।

তাই এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্টই ভরসা।

কোভিড-১৯ চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি একটি আশাব্যঞ্জক চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে সার্স-করোনাভাইরাস-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরিকৃত এন্টিবডি সরাসরি সদ্য সুস্থ হয়ে ওঠা কোভিড-১৯ রোগীর রক্ত থেকে নেয়া হয়।

তাই প্লাজমা ডোনেশনের আগে ডোনারের রক্তে প্রয়োজনীয় মাত্রার এন্টিবডি আছে কিনা সেটি দেখার জন্য এন্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে এন্টিবডি টাইটার দেখে নিতে হয়। যেমন- ১:১৮০ অথবা কমপক্ষে ১:১৬০ এন্টিবডি ডোনারের রক্তে থাকতে হবে।

আবার কারও কারও জিনগত ত্রুটির কারণে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার পরও প্রতিরোধী পরিমাণে এন্টিবডি তৈরি না হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সুস্থ হয়ে ওঠার পর দ্বিতীয়বায় কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার কিছু কিছু খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সেক্ষেত্রেও এন্টিবডি টাইটার করে ঐ ব্যক্তি কতটা ইমুউন সেটা নির্ণয় করা যেতে পারে। আবার ভ্যাকসিন দেওয়ার আগেও এন্টিবডি টেস্ট করে পূর্ববর্তী সংক্রমণ দেখে নিতে হয়।

কারণ ভ্যাকসিন শুধুমাত্র যারা কখনোই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়নি তাদের জন্য কার্যকর। তাই কেউ যদি ইতিমধ্যেই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে থাকে লক্ষ্মণহীন থাকায় সে নিজেও জানে না, সেক্ষেত্রে ভ্যাসিকন দিয়ে তার কোনো উপকার আসবে না।

পিসিআর পদ্ধতিতে টেস্ট করার জন্য বায়োসেফটি লেভেল ২+ নেগেটিভ প্রেসারের ল্যাবরেটরিতে দামী জটিল যন্ত্রপাতি, দামী টেস্ট কিটসহ মলিকুলার বায়োলজি এক্সপার্ট প্রয়োজন।

তাই প্রয়োজনের তুলনায় মলিকুলার টেস্টের সুযোগ খুবই কম এবং গ্রাম পর্যায়ে এটি অসম্ভব। আবার এন্টিবডি টেস্ট যেকোনো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিতে কম খরচে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দিয়ে করানো সম্ভব বিধায় এটি গ্রাম পর্যায়ে চালু করা সহজ।

গ্রাম থেকে শহর পর্যায়ে এন্টিবডি টেস্ট করা না গেলে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর কি হারে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে এবং কমিউনিটির মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা তা বোঝা সম্ভব নয়।

এজন্য অবশ্যই এন্টিবডি টেস্টিং শুরু করতে হবে। আশংকার কথা হলো- কমিউনিটি সংক্রমণ হলে কমিউনিটিতে লক্ষণহীন করোনা রোগী থাকবে এবং তাদের মাধ্যমে সহজেই কমিউনিটিতে অন্যান্য মানুষ, হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্য রোগীর মধ্যে করোনা ছড়িয়ে যেতে পারে।

এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্টিংই পারে কমিউনিটি সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে।

যদি এলাকাভিত্তিক প্রতিটি কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করে তাদেরকে আইসোলেশন করা না যায়, তাহলে ছোট বা বড় লকডাউন এমনকি কারফিউ দিয়েও কোনো লাভ হবে না।

এতে কেবল মানুষের দুর্ভোগই বাড়বে, ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ হবে না। তাই বাংলাদেশে টেস্টের পরিধি বাড়াতে হবে এবং এক্ষেত্রে এন্টিবডি টেস্ট যত শিগগির সম্ভব বাংলাদেশে চালু করতে হবে।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মলিকুলার টেস্টের পাশাপাশি এন্টিবডি টেস্টিংও হচ্ছে। মলিকুলার এবং এন্টিবডি টেস্ট- এই দুটো পদ্ধতিতেই ফলস পজিটিভ বা ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে।
মলিকুলার পিসিআর পদ্ধতিতে বাংলাদেশে যে কিট ব্যবহার করা হয় তা দিয়ে পজিটিভ আসার সম্ভাবনা নাসারন্ধ্রের শ্লেষ্মায় ৬৬% এবং মুখের লালাতে ৩৩% এর মত।

সম্প্রতি আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কয়েকটি কোম্পানির এন্টিবডি টেস্ট কিট অনুমোদন দিয়েছে যার সেনসিটিভিটি এবং স্পেসিফিসিটি ১০০ এর খুব কাছাকাছি।

যেমন- IgM/IgG এর জন্য Healgen COVID-19 IgG/IgM Rapid test Cassette, Hangzhou Biotest Biotech ও Autobio Anti-SARS-CoV-2 Rapid Test এবং শুধুমাত্র IgG বা IgM অথবা combined এর জন্য Ortho-clinical Diagnostics VITROS Immunodiagnostic products Anti-SARS-CoV-2 Total reagent pack and Calibrator, Roche Elecsys Anti-SARS-CoV-2, Abbott Architect SARS-CoV-2 IgG, Siemens Healthcare Diagnostics Atellica IgM SARS-CoV-2 total (COV2T) ও Mount Sinai Hospital Clinical Laboratory COVID-19 ELISA Antibody Test (সূত্রঃ FDA).

যেহেতু দেখা যাচ্ছে যে, একমাত্র এন্টিবডি টেস্টিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকটিভ ইনফেকশন, পূর্ববর্তী ইনফেকশন, লক্ষণহীন সংক্রমন, শরীরে ইম্যুউনিটি তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা, প্লাজমা ডোনার সিলেকশন, ভ্যাকসিনের সিদ্ধান্ত ইত্যাদি অনেক কিছুই নির্ণয় করা সম্ভব।

তাই এন্টিবডি টেস্টিং হতে পারে অনেক সমস্যার সমাধান।

লেখক: ক্লিনিক্যাল ভাইরোলজিস্ট সহযোগী অধ্যাপক মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, ধানমণ্ডি, ঢাকা।