ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মধ্যমে বৈসুকে আহ্বান জানিয়েছেন ত্রিপুরারা

প্রকাশিত: ২:২৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২২

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসুক কেন্দ্র করেই এখন পাহাড়ে পাহাড়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী গরয়া/গরিয়া নৃত্যে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী।চিনি হুকুমু চিনি সিনিমুং(আমাদের সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়) ও “ঐক্য শিক্ষা সংস্কৃতি ও প্রগতি” এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ কর্তৃক আয়োজিত বৈসু উৎসব -১৪৩২ ত্রিং ও য়ামুক একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন’র ব্যবস্থাপনায় খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে অলশগ্রহণ করেন ৭টি দল। অংশগ্রহণকারী ৭টি দল হচ্ছে,১.আলমনি পাড়া, ২.সাম্বারি পাড়া,ম৩.মাইজ্যা পাড়া,৪.হেডম্যান পাড়া,৫.চম্পাঘাট,৬.ছেট কাতারং,৭.হাজা পাড়া।সাধারণত গরয়া নৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের খেরেবাই বলা হয়।এদিন গরাইয়া/গরয়া নৃত্য শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত ও মুখরিত হয়ে উঠেন।জানা যায়,পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি (বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু)। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম ত্রিপুরা। ত্রিপুরারা বর্ষবরণ উদযাপন করে বৈসুক উৎসবের মধ্যদিয়ে। এ উৎসবের অংশ কয়েকশ বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গরয়া নৃত্য।

রোববার(১০এপ্রিল) বিকালের দিকে খাগড়াপুর জে.বি রেস্টুরেন্টের প্রাঙ্গণে এ গরয়া নৃত্য উৎসব উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।এ সময় বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সভাপতি সুশীল জীবন ত্রিপুরা’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি সদর দপ্তর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেড -জোন কমান্ডার ও পিএসসি লেঃ কর্ণেল সাইফুল ইসলাম সুমন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা দায়িত্বে ছিলেন য়ামুক একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক যুগান্তর ত্রিপুরা।

গরয়া/গরিয়া নৃত্য উৎসবে আয়োজক কমিটির প্রতিনিধিরা তথ্যানুযায়ী..বৈসু উৎসবের সময়েই যেহেতু গরয়া নৃত্য পরিবেশন করা হয়।সেহেতু বৈসু উউসব চলাকালীন সময়েই” গরয়/গরিয়া নৃত্য উৎসবের আয়োজন করা হয়।এ নৃত্য উৎসব প্রতি বছরের ন্যায় এই বছর হচ্ছে,আগামীতেও হবে।এ উৎসবে দূর-দূরান্ত ও প্রত্যন্ত অঞ্চল/এলাকা থেকে আগত গরয়া নৃত্য অংশগ্রহণকারী গরয়া/গরিয়া দলসমূহকে পুরস্কৃত করার অর্থ হচ্ছে এ নৃত্যকে সুসংগঠিত ও বিকশিত করার লক্ষে উৎসাহিত করা।আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈসু উৎসব ও গরয়া নৃত্য যে একে-অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটা বহুলভাব/বৃহৎ আকারে প্রচার করার লক্ষে এ “গরয়া নৃত্য উৎসব”র আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী,খাগড়াছড়ি রিজিয়ন(জিএস-২ আই),ও এসপি মোহাম্মদ জাহিদ হাসান,উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ শানে আলম,বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক প্রভাংশু ত্রিপুরা,খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক শেফালিকা ত্রিপুরা,বিশিষ্ট সমাজসেবক ও কার্বারী সুধাকর ত্রিপুরা,য়ামুক একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সভাপতি প্রমোদ বিকাশ ত্রিপুরা,মেজর মোঃ হাসনাত,প্রেস ক্লাবের সভাপতি জিতেন বড়ুয়া,বিটিকেএস’র সাধারণ সম্পাদক স্নেহাশীষ ত্রিপুরা মিঠু প্রমুখ।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নারী উদ্যোক্তা ও সমাজ-কর্মী শাপলা দেবী ত্রিপুরা,সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক ত্রিনা চাকমাসহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়,ত্রিপুরা জাতির আদি ধর্ম ও সংস্কৃতির চেতনাবোধের সাথে প্রাচীন জীবন -জীবিকা প্রণালী বিশেষভাবে সম্পৃক্ত।এ জীবিকা প্রণালীর আদিন্তর ছিল জুমভিক্তিক কৃষি চাষ পদ্ধতি।তাই গরয়া/গরিয়া দেবতাকে এক কথায় কৃষি দেবতাও বলা হয়।ত্রিপুরাদের বিশ্বাস গরয়া পূজা করলে প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা পায়,কীট পতঙ্গের উপদ্রব কমে ও মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।এ চেতনা নিয়ে বছর শেষান্তে বর্ষের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনাকে পেছনে ফেলে নতুন বছরে নতুন উদ্যমে কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে গরয়া পূজা ও নৃত্য পরিবেশন করে থাকে।ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো তাঁদের প্রধান দেবতা গরয়া/গরিয়া দেবের খেরাবই নৃত্য। গরিয়া পূজায় যাঁরা নাচে তাঁদেরকে বলা হয় খেরাবই। গরিয়া দেবের প্রতিমূর্তিকে বহন করে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায়,এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে গিয়ে নৃত্য পরিবেশন করে থাকে।যাকে খেরবাই দল হিসেবে বেশিরভাগ অভিহিত করা হয় । এটি শুধু দেখানো হয় না,এটি ত্রিপুরাদের জীবন-জীবিকার উপর খেলা ও অভিনয়।