কেএমকেএস’র উদ্যোগে বাল্যবিবাহ রোধে করণীয় বিষয়ে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২২


খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

“বাল্যবিবাহ রোধ করি,সহিংসতা হ্রাস করতে ভূমিকা রাখি”এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাল্যবিবাহ রোধে করণীয় বিষয়ে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার(৬ই মার্চ) বিকালে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার চেলাছড়া এলাকার নিতলময় ত্রিপুরা’র বাড়ির উঠান প্রাঙ্গনে খাগড়াছড়ি’র প্রান্তিক নারী ও কিশোরীদের ক্ষমতায়নে কর্ম-উদ্যোগ প্রোগ্রাম খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি(কেএমকেএস)’র আয়োজনে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা(GAC)’র অর্থায়নে এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন(MJF)’র সহযোগিতায় এ বাল্যবিবাহ রোধে করণীয় বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।এ সময় খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’র নির্বাহী পরিচালক শেফালিকা ত্রিপুরা’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারী উদ্যোক্তা ও সমাজ সেবক এবং কেএমকেএস ‘র নির্বাহী সদস্য শাপলা দেবী ত্রিপুরা।

এ সময় ককবাকসা নারী ও কিশোরী দলের সদস্য এলিনা ত্রিপুরা’র সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বর্নলিকা ত্রিপুরা।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা বলেন,আমাদের প্রত্যেকের অবস্থান থেকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ বিয়ের বয়স নিয়ে ভাবত না। এখন সবার মাঝে সচেতনতা এসেছে।

স্থানীয় প্রশাসন, গ্রামের মানুষ এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে কিছু প্রশ্ন এসেছে। তবে আমরা সবাই যদি সচেতন থাকি, তাহলে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া কোনো অবস্থাতেই মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে এবং ছেলেদের ২১বছরের বিয়ে হবে না।মেয়েদের ১৮এর নিচে এবং ছেলেদের ২১এর নিচে যদি বিয়ে হয়ে থাকে,তাহলে আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ।বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন রয়েছে। এ আইনে ২২টি ধারা আছে। এর ১৯ ধারা বিশেষ শর্ত–সম্পর্কিত। বাল্যবিবাহ হলেই এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

তিনি আরো বলেন,কিন্তু সমাজে ব্যাপক আলোচনা হয় শুধু বিশেষ বিধানটি নিয়ে। এ বিশেষ বিধানের সুযোগ নিয়ে যে কেউ ইচ্ছে করলেই বাল্যবিবাহ দিতে পারবে না। এখানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষার জন্য আদালতের অনুমতিসহ অনেক শর্ত পূরণ করলেই কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের বিয়ে হতে পারে।

কেএমকেএস’র নির্বাহী পরিচালক শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন,অপ্রাপ্তবয়স্কদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য একটি যাচাই কমিটি থাকবে। এ কমিটির প্রধান হলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। দুজন কিশোর-কিশোরীসহ স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা এ কমিটির সদস্য থাকবেন। এ কমিটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে যে বিয়ে না দিয়ে আর কোনো উপায় ছিল কি না। এরপরও কমিটির প্রতিবেদন আদালতে যাবে। আদালত এ প্রতিবেদন গ্রহণ করতে পারেন, প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন। বাল্যবিবাহ হতে হলে এতগুলো ধাপ পার হতে হবে। তাই যে–কেউ মনে করলেই বাল্যবিবাহ দিতে পারবেন না।

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মধ্যে আরও বেশি সচেতনতা ও পরিবর্তন আনাও প্রয়োজন। জাতিসংঘ শিশু সনদের ভিত্তিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে, যার মধ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়,খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতিও কাজ গুরুত্বের সাথে কাজ করেই যাচ্ছে।বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য জাতীয় এবং স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাপলা দেবী ত্রিপুরা বলেন,বাল্যবিবাহ বন্ধে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের শিক্ষার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। আবার এ শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে কতটা কার্যকর, সেটাও দেখতে হবে। মেয়েরা চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে কি না, সেটাও দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরী।

তিনি আরো বলেন,দেশে আইন থাকা সত্ত্বেও যৌন হয়রানি বেড়ে চলেছে। মেয়েদের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। ছেলেমেয়ে দুজনকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করা যাবেনা।

তথ্যানুযায়ী… মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ২১টি জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৬৫টি করে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাল্যবিবাহ ঘটার দিক দিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় হারের দিক থেকে সর্বোচ্চ এবং বিশ্বে চতুর্থ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন,পেরাছড়া ইউনিয়নের ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য রাঙ্গাবী চাকমা,৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিতু রঞ্জন ত্রিপুরা,আগাপে’র শিক্ষক সাগরিকা ত্রিপুরা,চেলাছড়া এলাকার মুরুব্বি নিতল ময় ত্রিপুরা ও
নিতলময় ত্রিপুরা এলাকার মুরুব্বি
বরেন্দ্র ত্রিপুরা প্রমুখ।এছাড়াও এলাকার শতাধিক নারী-পুরুষ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।