গল্প: রাতের শেষ কফি

প্রকাশিত: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২১

লেখক:-শামসুন্নাহার শেলী

দিনের শুরু টা একেক জনের কাছে এক এক রকম। আমার সকাল টা ঝরঝরে ভাব আনতে এক কাপ চা যথেষ্ট। তালিকায় অনেক কিছুই থাকে,তবে আমার এক কাপ ”চা” চাই তো চাই।আমি বিশ্বাস করি সারাদিন হাসি খুশি আর প্রাণবন্ত থাকতে এবং মন ও শরীর টাকে সতেজ রাখা প্রয়োজন, আর সেটাই যোগান দেয় এক কাপ চা, কফি ও থাকতে পারে। যাই হোক, যা বলছিলাম হ্যা দিনে রাতে ২/৩ বার চা অথবা কফি খাওয়ার অভ্যাস টা রয়ে গেছে।সকালে চা,বিকালে ব্লক কফি আর মাঝ রাতে এক কাপ চা অথবা কফি চলে প্রায় সময়ই। অনেক সময় বেশি ও খেয়ে থাকি। তার পর শুরু হয় গতিময় জীবনের কর্ম ব্যস্ততা একেক পর এক।আমি ঘড়ির কাটার মত টিক টিক করে চলতে থাকি,মিনিট পেরিয়ে ঘন্টা আসে,আর এ ভাবেই চলতে থাকে জীবনের চাকা।আমার ছোট পরিবার,চার সদস্যের সংসার,চলে যায় কোন মতে।অধিকাংশ সময়েই রাতের খাবার টা একসাথে খাওয়া হয়।তখন অনেক গল্প হয়।জিহাদ আমার ছেলে আর আমার মেয়ে জুই, সারাদিন বাইরে আর স্কুলে কি করলো সেটা বলতে থাকে,সাথে তাদের বাবা (জাবেদ সরোয়ার) ও কিছু বলে,এই ভাবেই খাওয়ার সময় টুকু শেষ হয়।

প্রতিদিন ছেলে,মেয়ে দুটোর সাথে ঘুমের আগে একটু একটু গল্প বলি,আজ ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।আমার ছেলে ও মেয়ে অনেক দুষ্ট তবে ভদ্র। ওদের কে ঘুম পাড়িয়ে লাইট বন্ধ করে দাড়িয়ে আছি জানালার পাশে,চোখ যত দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে,মন তার চেয়েও বেশি দূরে যেতে চাইছে।কিন্তু সব চাওয়া কি সম্ভব হয়,তাই দাড়িয়ে আছি আর ভাবছি,নির্দিষ্ট কিছুই না,এটা সেটা।রাত অনেক হয়েছে,নিস্তব্ধ চারিদিক,আলোর মাঝে আধারের খেলা,সাথে বাতাসের মিষ্টি ভালোবাসা।ভাবলাম আরো একটু উপভোগ করি রাতের নিরবতা। এক কাপ কফি নিয়ে ব্যালকণীতে দাড়িয়ে আছি।মন চাইছে নিরিবিলি রাস্তায় খুশি মত দৌড়াদৌড়ি করি,বাস্তবে তা সম্ভব নয়।চুপচাপ পরিবেশ সাথে কফি ভালোই লাগছে।
নিরব পৃথিবীতে আলো আধারের মাঝে তাকিয়ে দেখি কে যেন আসছে,তবে অনেক ধীর গতিতে।একটু একটু করে এগিয়ে আসছে,আমার আগ্রহ টা আরো বেড়ে যাচ্ছে,কে আসছে সেটা দেখার জন্য।এখন রাত প্রায় দুটো বাজে।এতো রাতে কেউ একা আসছে।আমি কফি টা খাচ্ছি আর দাড়িয়ে আছি কাপ টা হাতে নিয়ে। এতো রাতে কেউ ইচ্ছা করে জেগে থাকে না।দিনের সময় পার করা আর ঘুম হীন রাত পার করা এক কথা নয়।ঘুম যার আসেনা সেই জানে রাতের নিরাবতা কতটা যন্ত্রণা দায়ক। রাত সবার সমান যায় না।কারো স্বপ্নের মাঝে পার হয় রাত আর কারো চোখের পানিতে ভিজে যায় বালিশ।কফি টা প্রায় শেষের দিকে।
কিছু সময় পর আলোর মাঝেই খেয়াল করে দেখি কেউ একজন ধীর পায়ে হেটে আসছে। আরো একটু কাছে আসলো,রোডের আলোতে একটু চেনা মনে হচ্ছে,এবার ভালো ভাবেই চেনা যাচ্ছে।হ্যা আমি চিনতে পারছি,উনি ২৩নং রোডে থাকেন বাসার আংকেল। তার সাথে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক। প্রায় সময় দেখা হয় আমাদের, মাঝে মধ্যে সময় পেলে শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকি।হাসি হাসি মুখে বলেন,কেমন আছো মামনি,দিনক্ষণ ভালো যাচ্ছে তো,বাচ্ছারা কেমন আছে,এ ছাড়াও অনেক কথা হয় প্রায় আমাদের মধ্যে।কিন্তু আংকেল কে চিন্তিত মনে হচ্ছে।কেমন জানি কিছু ঝামেলা মনে হচ্ছে।আংকেল সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। একমাত্র মেয়ে ”তনু ”বিয়ে হয়েছে।আংকেল যে ভাবে হেটে যাচ্ছে মনে হচ্ছে খুব মন খারাপ। মাথা নিচু করে হেটেই চলেছেন। আমি ডাক দিব বলে হাত তুলেছি তখন মনে পড়ল সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে আর এখন অনেক রাত।সবাই ঘুম থেকে জেগে যাবে,তাই আর চিৎকার করে ডাকতে পারলাম না।এটা সেটা ভাবতে ভাবতেই আংকেল আমাকে ছাড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।আমি দাড়িয়ে আছি আংকেল কি করে সেটা দেখার জন্য, কিন্তু একটা সময় পর আর আংকেল কে দেখা যাচ্ছে না। তখন ও দাড়িয়ে আছি কিন্তু আংকেল আর ফিরলেন না।একবার ভাবছি আন্টির কাছে ফোন করে বলি,আবার ফোন টা হাতে নিয়ে রেখে দিলাম কারণ আমি বাইরের লোক আর এটা তাদের পারিবারিক ব্যাপার। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে আমি বিছানায় যায় আর এটা সেটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি।

পরদিন সকালে আমার কাজে সাহায্য করে ওর নাম “রানু” ।রানু আমাকে বলল,আপু জানেন,২৩ নং রোডের বাশার আংকেল গত রাতে মারা গেছে। ও আর কিছু জানে না।আমি ওকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে চললাম আংকেলের বাড়িতে।অনেকেই আছেন, তনু ও আসছে।ওকে জড়িয়ে কাঁদছে আর বলছে,আমি কেন যেতে দিলাম,কেন ধরে রাখলাম না। তারপর একটু একটু করে শুনলাম,রাতে দুজনে খাওয়ার পর তাদের মধ্যে অনেক কথা হয়।সবাই স্বাভাবিক কথা ছিলো,যে খানে দায়িত্ব,আদর,ভালোবাসা সবাই ছিলো।ভালোবাসার দাবিতে দুই জনই সমান ভাবে কথা বলে,যার ফল শ্রুতিতে আংকেল বলে,আমি ছাড়া তোমার কোন গতি নেই আর আন্টির বলে দিব্বি চলে যাবে।তখন এক কথায় দুই কথায় আংকেল বলে,ঠিক আছে,আমি তা হলে একাই থাকার অভ্যাস টা শুরু করি,বলেই চলতে শুরু করে।চলতে চলতে হটাৎ করে এক গেটের সামনে পড়ে যায়,দূর থেকে এক প্রহরী সেটা খেয়াল করে কাছে এসে তাকে ডাকে,তখন সে বলে,বুকে প্রচন্ড ব্যাথা করছে,নিশ্বাস নিতে পারছে না,বলছে আর থরথর করে কাপছে সারা শরীর।কাঁদছে আর বলছে,”শুধু একবার কেন ডাকলে না!হয়তো আমার কিছু ভুল ছিলো,তুমি ছাড়া আমি ও অসহায়,আমি তোমাকে এভাবে ছেড়ে যেতে চাইনি,আমাকে ভুল বুঝো না,তোমার আর কেউ রইলো না,আমি তোমাকে অনেক ভালো-বা-সি”,তারপর আস্তে আস্তে হাত,পা ছড়িয়ে দেয়।আর কোন কথা বলেনি।

আমি যখন ফিরে আসছি তখন বারবার মনে পড়ছিলো গত রাতের কথা,আর মনের মধ্যে কল্পনার জাল তৈরি হচ্ছিল। হয়তো দুইজনই ভেবেছিলো একে অন্যে কে ছেড়ে যাবে না,আর ভালোবাসা জয় হবে কিন্তু এখানে।

“শেলী”