পাড়াড়ের প্রান্তিক এলাকার দুঃখ-দূর্দশার গল্পের শেষ নেই,প্রায় সময় তাদের পেটে দু-মুঠো অন্ন জোটেনা

Jahid Jahid

Hasan

প্রকাশিত: ১১:২৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২১

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা(জ্যাক), খাগড়াছড়ি।।

পাহাড়ে দূর্গম এলাকায় বেশিরভাগ মানুষ এখনো সরকারির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইলেও দূর্গম এলাকা হওয়ায় সুযোগ -সুবিধা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছেন এসব অসহায় মানুষেরা। সেখানে নেই কোন পরিবহন যাতায়াত ও যোগাযোগের সু- ব্যবস্থা, নেই কোন উন্নতমানের ঘর-বাড়ি,বেসরকারি-সরকারি চাকুরীজীবি ও নেই। গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই নিরীহ,অস্বচ্ছল ও অসহায় এরা। সকাল হলে কেউবা বাঁশ দিয়ে পণ্য তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ বা বুনো শাক-পাতা খোঁজতে ভোর সকালে বের হয়। হাটঁতে এবং বুঝতে পারা শিশু থেকে বয়স্ক, বৃদ্ধা সবাই পেটের দায়ে ঝড়-বৃষ্টি-রোদ কে তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত কষ্ট করে চলছে সেখানকার গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাপন।গত বছর থেকে সেটাও করোনা মহামারীর প্রতিরোধে ধাপে ধাপে ও একের পর এক বিধি-নিষেধ,কঠো লকডাউনের কারণে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।এমতাবস্থায় তাদের কষ্ট আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রায় সময় তাদের পেটে একবেলা নুন-ভাত পর্যন্ত জোটে না।যে এলাকার কথা বলছি,সেটি খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের হাজাছড়া, সাথী পাড়া, গুইমারা পাড়া, মালতি পাড়া, তৈমাতাই পাড়ার বাসিন্দাদের অসহায়ত্বের কথা।

গেল রবিবার(১৮জুলাই ) সকাল থেকে হাজাছড়া পাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের একই পরিবারের পুত্র, বউ, পুত্র ও পুত্রবধুসহ আরও অনেকে বাঁশের পণ্যসামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের শিল্পীসূলভ হস্তের যাদুতে তৈরি হয় নানান ধরণের বাঁশের তৈরি পণ্য।

এ সময় তাদের সঙ্গে কথা হলে জানায়, বাঁশের তৈরি পণ্য বিক্রি করে কোনরকম সংসার চলে তাদের। তাও করোনা ভাইরাসের কারণে বাজারে বিক্রি করতে পারেনি। দিনে দু’বেলা ভাত ঠিক মতে অন্ন জোটে না। ইদানিং কষ্টের মধ্য দিয়ে পরিবার চলছেতাদের । বিদ্যমান পরিস্থিতিতেও দৃঢ় মনোবল নিয়ে বাঁশের পণ্য তৈরির পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন কুমার ছা ত্রিপুরা ও তার ছেলের পরিবার, রাজলক্ষী ত্রিপুরাসহ’ পাড়ার বেশ কয়েকটি পরিবার।

ছয় বছরের একজন স্কুল শিক্ষার্থী জঙ্গলের কচু ও লুটিকে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ করে সাজিয়েছেন। তাকে জিঙ্গেস করলাম, তুমি এটা কি করবা? উত্তরে শিশুটি জানান, কাল নাকি মাইসছড়ি হাঁটবাজার। সেগুলো সেখানে বিক্রি করে পরিবারে আংশিক পুরণ করে দেবো।

হাজাছড়া গ্রামের কুমার ছা ত্রিপুরা (ডাক নাম কান্ত কুমার) বলেন, বাঁশের তৈরি লাই (ত্রিপুরা ভাষায়) বিক্রি করে পায় জোড়া ২০০-২৫০টাকা। সপ্তাহে তৈরি করতে পারে এক জোড়া। বয়স ৬০বছর অতিক্রম করলেও তৎকালীন স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার(সদস্য)’র অসচেতনতার কারণে জন্মনিবন্ধন হিসাবে বর্তমানে তার বয়স চলে ৫৮বছর। সেজন্য বয়স্ক ভাতার জন্যও উপযুক্ত বয়স হয়নি। স্ত্রী জিবালা ত্রিপুরা (ডাক নাম খাদিন বালা), কন্যা সন্তান এবং পুত্র নাতি সন্তান নিয়ে থাকেন পাহাড়ের ঝুঁপড়ি একটি ঘরে। ছেলেরা বিয়ে করে যে যার মতো পৃথক হয়েছে। তারাও নিজেদের পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। এমতাবস্থায় তিনি সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা কামনা করেন।

একই গ্রামের রাজ লক্ষী ত্রিপুরা (৬৬) বলেন, বাঁশের তৈরি পণ্য ও বুনো শাক-সবজি বিক্রি করে চলে তার সংসার। থাকেন জরাজীর্ণ একটি ঘরে ৬বছরের একজন মেয়ে নাতিকে নিয়ে। স্বামী কয়েক বছর আগে মৃত্যু হয়েছে। এরপর থেকে তার কষ্টের সংসার। তার ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। তারা সকলে বিয়ে করে পৃথক সংসার করছে।ছেলেরাও তাদের পরিবার সামলাতে প্রচুর হিমশিম খাচ্ছে।তারাও আমাকে সহযোগিতা করতে পারছে না,এরা তো নিজেদের পরিবার ঠিকমতো চালাতে পারছেনা,আমাকে সহযোগিতা করবে কোন সামর্থ্যে। তবে তিনি অবশ্য সরকারি সহায়তা হিসেবে ৫বছর ধরে বিধবা ভাতা সুবিধা নিয়ে আসছে । পাশাপাশি তিনি বাঁশের তৈরি লাই(ঝুড়ি) বিক্রি করে পায় জোড়া ২৫০-৩০০ টাকা। সবজি বিক্রি করে পায় সপ্তাহে ১৫০-২০০টাকা। তা দিয়ে বৃদ্ধা বয়সে কষ্টের সংসার চলে তার। ঘরে নেই কোন ভালো মানের ছাউনী ও বেড়া। বাইরে দেখে দেখা যায়, ঘরের ভিতর কি আছে। মনে করে, যেন এটি মানুষের বাড়ি না, অকেজো একটি বাড়ি।

আরেক পরিবারের বিরন্ত ত্রিপুরা জানান, তার পরিবারের সবাই এই কাজের সঙ্গে জড়িত। স্বামী-স্ত্রী আমরা দু’জনে জঙ্গলের শাক-সবজি বিক্রি করে পরিবার চালায়। আমাদের কষ্টের কোন সীমা নেই।

হাজাছড়া পাড়ার কার্বারী রতন ত্রিপুরা জানান, আমাদের গ্রামে ৬০’র বেশি পরিবার রয়েছে। শতভাগ পরিবারই খেতে খাওয়া ও সকলেই প্রায় খুব অসহায় । সরকারির সহযোগিতাও তুলনামুলক ভাবে অনেক কম পায়। নাই কোন সরকারি চাকুরিজীবি, নাই কোন জমিদার। অধিকাংশ পরিবার দিনমজুরী,বন- জঙ্গলের শাক-সবজি বিক্রি করে তাদের সংসার চলে। পাশাপাশি বাঁশের তৈরি পণ্য তৈরী করে তা বিক্রি করে সংসার চলে। ২০২০ সালে করোনাকালীন তাদেরকে করে দিয়েছে আরও দিশেহারা। করোনার ২য় ঢেউয়ের সরকারি প্রণোঢনা প্যাকেজের কোন সহায়তা এখনো পাইনি আমাদের গ্রামের মানুষ। শুনেছিলাম, ওয়ার্ডের মেম্বার বিমল কান্তি চাকমা নাকি গ্রামের কয়েকজনের এনআইডি সংগ্রহ করছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ খবর পাইনি। হয়তোবা মেম্বার-চেয়ারম্যানরা এ বিষয়ে বলতে পারবে।

এসময় তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বে-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিকভাবে সহায়তা পেলে গ্রামে কিছুটা মানুষ সচ্ছল হবে।

৪নং মাইসছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান সাজাই মারমা জানান, গত বছর করোনাকালীন সরকারি বরাদ্দ যা পায় সাধ্যমতো অসহায়দের মাঝে বিতরণ করে দিয়েছি। আমরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছি দুর্গম অঞ্চলে, যাতে তারা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পায়। পরে এবছর করোনার ২য় ঢেউয়ের সরকারি সহায়তা হাজাছড়া গ্রামে দিয়েছেন কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, সবকিছু মোবাইলে বললে হবে না, প্রতিনিধিকে অফিসে আসতে বলেন। পরে আরও বলেন, এসব বিষয়ে রেজিষ্টার খাতায় সব লিপিবদ্ধ আছে। খাতা দেখলে জানতে পারবে।