বাল্যবিয়ে সমাজের একটা অভিশাপ;সিভিল সার্জন নুপুর কান্তি দাশ

প্রকাশিত: ১২:৫৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০২২

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

“শিক্ষায় নারী ক্ষমতায়নের মূল হাতিয়ার” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সিডা’র অর্থায়নে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’র কারিগরি সহায়তায় এবং ওয়াই-মুভস প্রকল্প, জাবারাং কল্যাণ সমিতি’র
বাস্তবায়নে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার(SRHR) এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ক আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপ ও শতাধিক কিশোরীদের মাঝে স্যানিটারী প্যাড বিতরণ করা হয়েছে।

সোমবার(১৪মার্চ)সকালের দিকে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যলয়ের হল রুমে আন্তঃপ্রজন্ম বিষয়ক সংলাপ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আলোচনা সভা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।এ সময় খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত চাকমা’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস।

অনুষ্ঠানে ওয়াই-মুভস প্রকল্পের সেফগার্ডিং ফোকাল ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি’র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর বিনোদন ত্রিপুরা সঞ্চালনায় অতিথি’র বক্তব্যে কিশোর-কিশোরীদের উদ্দেশ্যে সিভিল সার্জন নুপুর কান্তি দাশ বলেন,একটা কিশোরীদের জরায়ু পরিপক্ব হতে হলে কমপক্ষে ১৮বছর হতে হবে।তা না হলো অনাকাঙ্খিত সন্তান ধারণ হতে পারে।বাল্যবিয়ে সমাজেরএকটা অভিশাপ।বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে মেয়েদের যে শারীরিক পরিবর্তন ঘটে সে সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক সময় শারীরিক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। প্রজনন স্বাস্থ্যের অন্যতম শর্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। বিশেষত মেয়েদের ঋতুস্রাব সময়কালীন পরিচ্ছন্নতা বিশেষ জরুরি। নিয়মিত গোসল, জনন অঙ্গ পরিষ্কার রাখা সবসময়ই উচিত। এ সময় পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ ও প্রচুর পানি পান করতে হয়। তা না হলে শরীর দুর্বল বোধ হতে পারে। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হলে প্রজনন স্বাস্থ্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে এবং সন্তান ধারণ মা ও শিশুর জীবনকে রোগাক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই প্রাপ্ত বয়সের (১৮ বছর) আগে মেয়েদের বিয়ে দেয়া রীতিমত অপরাধ। নিয়মতান্ত্রিক, পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করলে যৌন রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা যাবে। অর্থাৎ সুস্থ, সুন্দর, প্রফুলস্ন ও ঝুঁকিমুক্ত জীবনযাপনের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্যরক্ষা একান্ত জরুরি।

তিনি আরো বলেন,এখানে লজ্জ্বা পাওয়া কোন কারণ নেই,আমাদেরকে শিখতে হবে।কিশোর-কিশোরীদের শরীরের হরমোনের প্রভাবের কারণে নানান ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়।লজ্জ্বা না পেয়ে এই বিষয়ে মা-বাবাদের জানাতে হবে।কোন রকম এটাকে অবহেলা কিংবা লজ্জ্বা পাওয়া যাবেনা।

তিনি আরো বলেন,কোন বয়সে বিয়ে করতে হবে?কখন বিয়ে করতে হবে?সেটা শিক্ষার মাধ্যমে সে বিষয়ে অবশ্যই জানতে হবে।আমাদের দরকার মা-বাবাদেরকে বলতে হবে।কিশোর-কিশোরীদের জন্য সদর হাসপাতাল এবং মা ও শিশু হাসপাতালে কিশোর কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে।তাদের যেকোন শারিরীক তথা যেকোন গোপনীয় বিষয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্তে সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন

অন্যান্য বক্তারা বলেন,কিশোর কিশোরীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরির জন্যই সরকার নানান ধরনের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।স্কুল পাঠ্যক্রমে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ঠিকভাবে শেখানো হয় না। এই কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধির ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণাও নেই। শতকরা ১৭ ভাগ কিশোর ও ২৭ ভাগ কিশোরী ঠিকমত কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির নাম বলতে পেরেছে।আদতে তাদের স্কুলের বইতে শুধু একটি অধ্যায়েই কৈশোরকালীন শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, তাও কেবল মাসিক ও বয়ঃসন্ধি নিয়ে আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ।

এদিন অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিক্ষাই নারী ক্ষমতায়নের মূল হাতিয়ার বিষয়ক প্রীতি বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।এতে পক্ষ-বিপক্ষ দুটি দল এ প্রীতি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।পরিচালনা করেন মডারেটর এবং বিচারক মন্ডলীরা।
সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক নিখিল কুমার মন্ডল মডারেটর হিসেবে এবং প্রিয় বসু ত্রিপুরা,মোঃ ছফর আলী,শফিকুল ইসলাম বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।বিতর্ক প্রতিযোগিতায় “পক্ষ” দলে অংশ নেন অর্জিতা চাকমা,ইরতিজা ফাইরুজ ইরা,সামিয়া মাহমুদ ও ফ্লোরেন্স রোয়াজা এবং “বিপক্ষ” দলে অংশ নেন সাদিয়া।ইসলাম নীলা,ইশরাত জাহান,ঋদ্বিকার চাকমা ও সানজিদা ইসলাম সূচি।প্রতিযোগিতা শেষে বিপক্ষ দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।পরে অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ী এবং অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পুরস্কার(ক্রেস্ট) তুলে দেয়া হয়।

এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী,জেলা সিভিল সার্জন ডা. নুপুর কান্তি দাশ,জাবারাং কল্যাণ সমিতি’র নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম বিভাগের এসএমসি মোঃ আবদুল্লাহ আল মামুন,পেরাছড়া ইউনিয়নের ১-২-৩নং ওয়ার্ডের নারী সদস্য চনিতা ত্রিপুরা প্রমুখ।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাবারাং কল্যাণ সমিতি’র প্রশাসনিক কর্মকর্তা ধনেশ্বর ত্রিপুরা, প্রোগ্রাম অফিসার দোলন দাশ,ভলান্টিয়ার ম্রাসাইন্দা মারমাসহ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা উপস্থিত ছিলেন।