ঢাকা, ৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

বিচ্ছিন্ন হাত জোড়া লাগিয়ে সিলেটের পাঁচ চিকিৎসক নতুন ইতিহাস রচনা করলেন


প্রকাশিত: ১১:২২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২১

এক রোগীর বিচ্ছিন্ন হাত জোড়া লাগিয়ে দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন সিলেট মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের পাঁচ চিকিৎসক। শুক্রবার (৯ জুলাই) রাত নয়টা থেকে ভোর পাঁটটা পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হাতটি জোড়া লাগানো হয়।

অস্ত্রোপচার টিমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের (সিওমেক) বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান। সদস্য হিসেবে ছিলেন সিওমেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. মাসুদ হোসেন, অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তওফিক আলম সিদ্দীকী, অ্যানেস্থেসিয়া ডা. এন এ শোভন ও ডা. পল্লব।

আজ বুধবার (১৪ জুলাই) দুপুরে মেডিভয়েসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন অস্ত্রোপচার টিমের সদস্য ডা. মো. মাসুদ হোসেন।

সিওমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ‘গত ৯ জুলাই বিকেলে একজন রোগী ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। রোগীর শরীর থেকে হাত বিচ্ছিন্ন ছিল। আর মাইক্রো সার্জারির সব যন্ত্রপাতি সিওমেকে নেই। তাৎক্ষণিক সিওমেক হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রী ও সার্জারির পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায়, স্থানান্তরের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।’

জানতে চাইলে ডা. মাসুদ হোসেন বলেন, ‘ডা. আব্দুল মান্নান স্যার এর আগে একটি আঙ্গুল ও একটি হাত রিপ্লানটেশন করেছেন। সেই হিসেবে হয়তো রোগীর স্বজনরা তথ্য পেয়ে রোগীকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করেন। রোগীর অবস্থা দেখে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা স্যারকে জানান। এরপর স্যার বিস্তারিত দেখার পর, অপারেশন করার জন্য বলেন। ওই দিন রাত নয়টার দিকে অপারেশন শুরু হয়, ভোর পাঁচটার দিকে সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই প্রথম বিচ্ছিন্ন একটা হাত জোড়া লাগানোর টিমে কাজ করেছি। স্যার আমাকে রেখেছেন এ জন্য স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এখন রোগীর অবস্থা উন্নতির দিকে।’

টিম প্রধান ডা. আব্দুল মান্নান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘একজন মানুষের হাত আছে, আরেকজন মানুষের হাত নেই। এতে পার্থক্য করলেই বোঝা যায়। মানুষের একটি আঙ্গুল নষ্ট হলেও আমাদের কাছে অনেকে লজ্জায় কাপড় পেচিয়ে আসেন। হাত মানুষের শারীরিক একটি সৌন্দর্য। হাত ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে আনন্দ, তা বোঝানো যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের হাত যদি না থাকে, ইলেকট্রিক হাত লাগান। তাতে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হবে। সেই হাতও স্বাভাবিক হাতের মত বেশি কাজ করবে না। নিজের হাতের অনুভূতিই আলাদা রকম। এই হাত রিপ্লেস করতে পেরে আমার কাছে খুবই ভালো লাগছে। রোগীর অবস্থা উন্নতি দিকে। হাতটি স্থায়ী হয়ে গেলে ভালো লাগবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা মানুষের হাত কেটে গেলে জোড়া লাগানোর বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। ঢাকা মেডিকেল ও শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে কিছু সুযোগ আছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি দরকার। কাটা হাত সঠিকভাবে না নিয়ে আসার কারণে অনেক হাতের সাফল্যজনক অপারেশন করা যায় না। হাত সংযুক্ত করতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে। আর না হয়, অপারেশনের পর টিকার সম্ভাবনা কম, হাত লাগাতে নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৯ সালে আমি যখন প্রথম হাত প্রতিস্থাপন করলাম, তখন ভাবলাম কিভাবে হাতটাকে প্রিজার্ভ করে নিয়ে আসা যায়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সরকারিভাবেই পরিকল্পনা হওয়া উচিত, যেটাকে রিপ্লানটেশন সেন্টার বলে। যেখানে একটা ডেডিকেটেড টিম থাকবে। যেখানেই হাত কাটা যাবে, রোগী চলে আসলে সবসময়ের জন্য তাঁরা প্রস্তুত থাকবে এবং কাটা হাত নিয়ে আসলেই সহজে রিপ্লানটেশন করতে পারবে। এটা একজন চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব না। এখানে আট থেকে ১০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হয়। আর দুইটা টিম হলে ভালো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাউন্ট এডোরাতে নিজস্ব কোনো টিম নেই। আমার যাকে যাকে লাগবে নিজেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে সবাইকে ফোন দিয়ে এনেছি। সিলেট ট্রমা সেন্টার থেকে কিছু যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে এবং আমার ব্যক্তিগত যন্ত্রপাতি ছিল। একাজগুলো করার জন্য নিবেদিত একটা টিম প্রয়োজন। আর এজন্য মানুষের সচেতনা খুব জরুরি। কাটা হাতটি সঠিক পদ্ধতিতে নিয়ে আসা খুব জরুরি। হাতে পানি লাগিয়ে নিয়ে চলে আসলে, এটি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা খুবই কম। হাতটি পরিষ্কার করে পলিথিনে নিতে হবে। আরেকটি পলিথিতে বরফ দিতে হবে, বরফ লাগানো পলিথিনের মধ্যে কাটা হাতটি রাখা পলিথিনটি রাখতে হবে। এভাবে কাটা হাতটি যদি সঠিকভাবে ফ্রিজ আপ করা হয়। অনেক সময় এ হাত ছয় থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জোড়া লাগানো হাত ভালো হওয়ার পর, হাত দিয়ে দৈনন্দিন সব কাজ করা সম্ভব। রোগী প্রথমে খুবই চিন্তার মধ্যে ছিল, হাত ভালো হবে কি হবে না। এর আগে সফলভাবে একটি হাত লাগানোর গল্প আছে, তখন আমাদের উপর নির্ভর হয়েছেন। টিমের সদস্যরা আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।’

এক নজরে ডা. মো. আব্দুল মান্নানঃ

ডা. আব্দুল মান্নান রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এমবিবিএস থেকে সম্পন্ন করেন। তিনি ২০০২ সাল থেকে প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি ২০০৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ডা. আব্দুল মান্নান ২০০৮ সালে এমসিপিএস ও ২০১২ সালে এফসিপিএস এবং ২০১৩ সালে এমসিপিএস (প্লাস্টিক সার্জারি) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি ২০০৮ সালে সিলেটের বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি সাব-সেন্টারের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) প্লাস্টিক সার্জারিতে দায়িত্ব পালন করেন।

ডা. আব্দুল মান্নানের বাড়ি সিলেটের বড়লেখা উপজেলায়। ছোটবেলা থেকে তাঁর ইচ্ছা ছিল নিজ জেলার মানুষের সেবা করার। তাঁর স্ত্রী একজন চিকিৎসক। তিন সন্তানের জনক তিনি।

২০১৪ সালে ঢাকা থেকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারিতে বদলি হয়ে যান। বর্তমানে তিনি সিওমেক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। সিলেটে একমাত্র প্লাস্টিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশব্যাপী ডা. আব্দুল মান্নানের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।