বিলাসিতার করাল গ্রাসে পরিবেশঃ অনন্যা দাস

প্রকাশিত: ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ৫, ২০২২

পরিবেশ দূষণের একটি অন্যতম কারণ হয়ে দাড়িয়েছে আমাদের বিলাসবহুল জীবনের প্রতি অনুগামিতা। বিলাসিতার বেড়া জাল আমাদের নির্মল পরিবেশকে ধীরেধীরে এতটাই বিষাক্ত করে ফেলেছে যে, ধারনা করা যাচ্ছে কয়েক শতকের মধ্যেই হয়তো প্রাণ খুলে নিশ্বাস নিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে ঝুলিয়ে ঘুরতে হবে। বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, আসবাবপত্র সহ নিত্য ব্যাবহার্য প্রতিটি জিনিসের মধ্যে মানুষ আজ বিলাসিতাকে খোঁজে। তারা একবারও ভাবে না এই জিনিসগুলো পরিবেশের বিরূপ পরিবর্তনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে। বিলাসবহুল প্রতিটি জিনিসের মধ্যেই থাকে অত্যাধীক চাকচিক্য তাই সাদামাটা সকল কিছুতেই আজ মানুষ আগ্রহ হারাচ্ছে ।সাদামাটা এই জিনিসগুলোই হয়তো খুব সুন্দরভাবে আমাদের জীবনের সাথে মানিয়ে যেত কিন্তু আজকাল আমরা তা গ্রহন করতে নারাজ,লোকদেখানো আয়োজনে আমরা মত্ত।

বাংলাদেশের মতো একটি নাতিশীতোষ্ণ দেশের অধিবাসী হয়েও আজ ঘরে ঘরে চলছে এসি, রুম হিটার ইত্যাদি । যদিও এই যন্ত্রগুলোর আবিষ্কার কেবল অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা অঞ্চলে ব্যবহারের জন্যই হয়েছিল কিন্তু জলবায়ুর আমল পরিবর্তনে আজ আমরাও প্রকৃতির নিয়মে কুন্ঠিত। ছয় ঋতুর এই দেশে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা মৌসুম টের পাওয়াই দায়। জলবায়ুর এই পরিবর্তনে আমরা নিজেরাই দায়ী,দায়ী আমাদের ব্যায়বহুল চিন্তাভাবনা। প্রকৃতিও এর দায় স্বরূপ আমাদেরকে দিয়েছে চরম শাস্তিঃ খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল থেকে শুরু করে নিশ্বাস নেয়ার বায়ুতে পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে চরম বিষাক্ততা। ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও সত্যি যে, বনজঙ্গল উজাড় করে গাছপালা কেটে কারুকাজ খচিত দামী আসবাবপত্র সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে এখন আমরা একটু শান্তিতে নিশ্বাস ফেলতে ছুটে যাচ্ছি অরণ্যে ঘেরা কোন কৃত্রিম রিসোর্টে। নদীমাতৃক এই দেশে দেখা দিচ্ছে বিশুদ্ধ পানির অভাব,গ্রীষ্মের দাবদাহে মানবজীবন হচ্ছে অতিষ্ঠ। এর কারণ নদীনালা খালবিল ভরাট করে চলছে বহুতল ভবনের কাজ আর নদী দূষণের চরম রূপ তো আছেই।ছোট ছেলেমেয়েদের খেলনার বেশিরভাগ তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক থেকে যেখানে প্রকৃতির মাঝে একটি মানবসন্তান বেড়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বেশি আনন্দ নিয়ে।এছাড়াও প্লাস্টিক আবিষ্কার হয়েছিল বন্যপ্রাণী রক্ষায় কিন্তু তার অতিমাত্রায় চাহিদা এবং ব্যবহারের ফলে এটিকে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিস্ফোরক বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিলাসিতা কেবলমাত্র স্বার্থপরতা বই অন্য কিছু না। মানুষ এই চিন্তাভাবনায় কেবল নিজের সখ আহ্লাদকে নিয়ে ভাবে অন্য আর দশটা লোক বা পরিবেশকে নিয়ে নয়। এই বিলাসিতার আরও একটি নাম আছে তা হচ্ছে শৌখিনতা। এই বিলাসিতা, শৌখিনতার নামে চলে পরিবেশকে ধ্বংসের আড়ম্বরতা। প্রায় সময়ই দেখা যায় অর্থবিত্তরা বন্যপ্রাণী যেমনঃ বাঘ,কুমির, হাতি ইত্যাদির চামড়া দিয়ে জুতা,ব্যাগ,পোশাক সহ বিভিন্ন কিছু ক্রয় করে থাকে। এরা তাই পরোক্ষভাবে অন্যকেও এই কাজ করায় প্ররোচিত করছে।সুযোগ আর অর্থ হলে স্বাভাবিকভাবে অন্যরাও তা ক্রয় করতে চাইবে। এতে যে বন্যপ্রাণী তথা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা একবারও ভাববে না। এরকম হাজারো শৌখিনতা ও বিলাসবহুল চিন্তা আমাদের প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত ক্ষত বিক্ষত করছে। পরিশেষে জগতের প্রতিটি জিনিস আবিষ্কার করা হয়েছিল মানবসভ্যতার উন্নয়নে কিন্তু আমাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের উত্তেজনা প্রায় সকল কিছুকেই কাল করে দিয়েছে পরিবেশের জন্য এর থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে চরম মূল্য দিতে হবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মেকে। পরিশেষে এবারের পরিবেশ দিবসে আমাদের সকলের অঙ্গীকার হোক স্বল্প সময়ের বিলাসিতা যেন পরিবেশকে কোনক্রমেই ক্ষতি না করে।

অনন্যা দাস
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।