বেনাপোলে সুদ ব্যবসায়ী হাশেমের বিরুদ্ধে বসতবাড়ী দখলের অভিযোগ

Jahid Jahid

Hasan

প্রকাশিত: ৩:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২১

জাহিদ হাসানঃ
যশোরের বেনাপোলে সুদ ব্যবসায়ীর (দাদন ব্যবসায়ীদের) ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে এলাকর সহজ সরল সাধারণ মানুষ। চড়া সুদের টাকা সময় মতো পরিশোধ করতে না পারায় অনেক পরিবার,ব্যবসায়ী বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সুদ ব্যবসায়ীরা কখনো সাদা কাগজে কখনো অলিখিত স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর/টিপসহি রেখে টাকা দেয়ার পর তাদের ফাঁদে আটকানোর অভিযোগ রয়েছে বেনাপোলের ভবেরবের গ্রামের বিশিষ্ট সুদ ব্যবসায়ী হাশেম আলীর বিরুদ্ধে।

করোনাকালীন এই দুর সময়ে সুদের টাকা সময় মতো পরিশোধ না করতে পারলে কারও কারও জোর করে জমি রেজিস্ট্রি করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেনাপোল ভবারবের সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন অনেক ব্যবসায়ীর খোঁজ পাওয়া গেছে। অনেকেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ফেলে রাতের আধাঁরে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই সুদ ব্যবসায়ীদের হুমকীর কারণে থানায় অভিযোগ করারও সাহস পাচ্ছে না। তবে শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেছেন অভিযোগ পেলে এসব অবৈধ ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বুধবার (১৪ই জুলাই) অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, বেনাপোলে অনেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা ও জীবিকার প্রয়োজনে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন অভাব অনটনে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, দিনমজুর, শিক্ষকসহ শত মত মানুষ। এসব মানুষদের কষ্টের আয়ের প্রায় সবটাই চলে যায় সুদি ব্যবসায়ীদের পকেটে। তবে একাধিক সুদি কারবারি বলেন, আমরা কাউকে জোর করে টাকা দিই না। নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের কাছে এসে তাঁরা টাকা নেন। সারা দেশের মতো একই নিয়মে আমরাও টাকা আদায় করি। ক্ষতিগ্রস্থরা বলছেন, বিপদে পড়ে চড়া সুদে নগদ টাকা নিতে বাধ্য হই। এভাবে সারা মাসে ব্যবসার অর্ধেক টাকা তাদের পকেটে চলে যায়। দিনরাত পরিশ্রম করেও সংসারের অভাব-অনটন লেগেই থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেনাপোলের ভবেরবের গ্রামের ব্যাংকের পিয়ন আলী আকবার স্থানীয় দাদন (সুদ) ব্যবসায়ী হাশেমের কাছ থেকে গত ৫ বছর আগে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা সুদ দিবেন এ শর্তে ৩ লক্ষ টাকা নিয়ে একটি ব্যাবসা শুরু করেন। গত একবছরে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সুদ দেন। সংসারের খরচ চালিয়ে ও সুদের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পরেন, গত তিন বছরে ৩ লক্ষ টাকার সুদ বেড়ে ৯ লক্ষ টাকায় গিয়ে দাড়ায়। বন্ধ হয়ে যায় সুদের দেনা পরিশোধ। টাকার জন্য গত ২ বছর আগে আলী আকবারকে শার্শায় আটকে রেখে তার মাকে ডেকে নিয়ে টিপ সই নিয়ে তার জমি লিখে নেয় সুদি কারবারী হাশেম আলী। টিপ সই নেওয়ার পর আলী আকবরের পরিবার তাকে আর খুজে পায়নি।
এই বিষয়ে আলী আকবরের মা তফুরন নেছা বলেন, টাকা জামিন্দার হিসাবে আমার একটি টিপসই নিয়েছে হাশেম আলী। আর আমি এতদিন জানতাম আমার ছেলে দেনার ভয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছে কিন্তু এখন হঠাৎ করে দেখছি হাশেম আমার বসতভিটা দখল আামাদের উচ্ছেদ করতে এসেছে। আমি এবং আমার ছেলে নাকি তাকে আমার বসবাসের বসতভিটা তাকে লিখে দিয়েছি। এবিষয়ে আমি বেনাপোল পোর্ট থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছি। সর্বশেষ বিষয়টি আমি গণমাধ্যম কর্মীদেরকে জানায় সঠিক বিচারের আশায়। আমার স্বামীর ভিটা থেকে এখন এভাবে তারিয়ে দিলে আমি পুত্রবধূ এবং নাতি নাতনি নিয়ে কোথায় যাবো।
আলী আকবরের মত এ রকম বহু পরিবার বেনাপোলের বিভিন্ন গ্রামে দাদন ব্যবসায়ীর ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। হারাচ্ছেন ভিটে, বাড়ি আর সাজানো সংসার। প্রশাসনিক কোন পদক্ষেপ না থাকায় দিনের পর দিন পুরো বেনাপোল সুদ কারবারীদের দাপট বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুরসহ সাধারণ মানুষ।

তথ্য নিয়ে জানা গেছে, বেনাপোল পৌরসভাসহ বিভিন্ন গ্রামে দাদন ব্যবসা এখন জমজমাট। শিক্ষক, হোটেল, ক্ষুদ্র ব্যবসা, দিনমজুর, ভ্যান ও রিকশা চালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সংসার চালাতে গিয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। বেনাপোলের অপর এক ভুক্তভোগী ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ী ফিরোজ হোসেন এ রকম অসহায়দের মধ্যে একজন। তিনিও এই সুদকারবারী হাশেম আলীর অত্যাচার আর নির্যাতনে টাকা সব পরিশোধ করতে না পেরে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন আর খুলতে পারছেননা।
স্থানীয়রা বলছেন, দাদন বা সুদ ব্যবসা আইন সম্মত বা বৈধ না হওয়া সত্ত্বেও এই ব্যবসার সাথে জড়িতদেরও নানা কুট কৌশলের কারণে সমাজে এদের বিরুদ্ধে কেউ ‘টু’ শব্দটি পর্যন্ত করা পারছেনা। কিন্তু দিনে দিনে এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিটি গ্রামে সুদের ব্যবসা ভয়াবহ বিষের ন্যায় ছড়িয়ে পরেছে। সুদ ব্যবসায়ীদের এখনই থামানো না গেলে এর ভয়াবহতা আরও বাড়বে। দাদনের ফাঁদে পড়ে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দাদন ব্যবসায়ীরা টাকা দেওয়ার সময় জমির দলিল, ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রাখেন। যখন কেউ টাকা ফেরত দিতে না পারে তখন ওই চেক স্ট্যাম্পে ইচ্ছেমত টাকা বসিয়ে পাওনাদারের নিকট দাবি করে। অনেক সুদি ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার আশায় এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। এমনি একজন ব্যাক্তি হাশেম আলী যে কিনা লোক দেখানো জেনারেটর এবং সমিতি ব্যবসা থেকে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। তার বেনাপোল বাজারে গুরুত্বপূর্ন স্থান সহ কয়েকটি জায়গাই বাড়ী ও জমি রয়েছে সুদের টাকা ফেরত না দেতে পেরে অনেকের কাছে থেকে জোরপূর্বক এসব সম্পদ লিখে নিয়েছে বলে অনেকে মতপ্রদান করেছেন। বেনাপোলের সাধারন মানুষও তাকে সুদখোর হাশেম বলে এক নামে চেনে।

তারা আরও বলছেন, তাদের বেঁড়া জালে বন্দী হয়ে অনেক সহজ সরল সাধারণ মানুষ জমি, ঘড়-বাড়ি থেকে শুরু করে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। অনেক এলাকায় দাদন ব্যবসায়ীদের অত্যাচারে মানুষ ঘর-বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে তাদের অত্যাচারে বাড়ি ফিরতে পারছেনা। কেউ কিছু বলতে পারে না। ফলে সুদের বোঝা টানতে না পেরে নিরবেই কাঁদছে অনেকে। ঋণের দেনা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যার মত ঘটনাও ঘটছে। অনেক ব্যবসায়ী মানসম্মানের ভয়ে মুখই খোলেন না।

এ রকম সুদ ব্যবসায়ী বেনাপোলের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি বিক্রি করে সুদের চক্রবৃদ্ধির কয়েক গুণ টাকা শোধ করতে গিয়ে পথে বসেছেন। এসব দাদন ব্যবসায়ীর খপ্পর থেকে বাঁচতে নানা পেশার মানুষ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এবিষয়ে হাশেম আলীর সাথে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, আমার বিষয়ে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি নগদ ১৫ লক্ষ টাকা দিয়ে আকবার আলী ও তার মায়ের কাছ থেকে জমিটা কিনেছি। তার মাকে কত টাকা দিয়েছেন বললে কল কেটে দেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান বলেন, এলাকায় সুদি কারবারীদের কবলে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছে অনেক মানুষ। তারা টাকা ধার দেওয়ার নামে নিরীহ মানুষকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। লাখে প্রতি মাসে ১০/১৫ হাজার টাকার সুদ দিতে না পেরে অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে । টাকা দিতে না পারলে তারা অত্যাচার নির্যাতন এমনকি মামলাও করেন। ফাঁকা স্ট্যাম্প বা চেকে স্বাক্ষর রেখে টাকা দিতে না পারলে মূল টাকার দ্বিগুণ বাড়িয়ে লেখে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক এবং স্টাম্পে। আমি এই সকল সুদ ব্যবসায়িদের কঠোর শাস্তির দাবী জানায় প্রশাসনের নিকট।