ভার্চুয়াল ভাইভার কথা ভাবছে পিএসসি

প্রকাশিত: 5:15 PM, June 4, 2020

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে সরকারের অন্যান্য সংস্থার মতো পিএসসিও (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) যেন স্তব্ধ হয়ে আছে; না করলেই নয় এমন কাজগুলোই করছে। পিএসসির প্রাণ হচ্ছে কমিশন। কিন্তু ‘বয়োবৃদ্ধ কমিশন’ যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুও করতে পারছে না। কারণ বৈশ্বিক এই মহামারীতে বয়োজ্যেষ্ঠরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
এসব কারণে ক্যাডার-ননক্যাডার সব পরীক্ষা কার্যত থেমে আছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ভার্চুয়াল ভাইভাতে যেতে চাচ্ছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। লিখিত পরীক্ষাসহ অন্যান্য কাজও সাধ্যমতো এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কমিশনের সদস্যসহ অন্য কর্মকর্তারা।
পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেছেন, ‘বয়োজ্যেষ্ঠদের দিয়েই কমিশন হয়। চাকরি থেকে যারা অবসরে যান তারাই কমিশনে অন্তর্ভুক্ত হন। স্বাভাবিকভাবেই তারা একটু বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কিন্তু কমিশন থেমে নেই। চিকিৎসক-নার্সদের নিয়োগ হলো। অন্যান্য কাজও শুরু হয়েছে।
’ পিএসসি ভার্চুয়াল ভাইভাতে যাচ্ছে কি না জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘বিষয়টি বেশ জটিল। বললেই রাতারাতি সিস্টেম বদলিয়ে অন্য সিস্টেমে চলে যাওয়া যাবে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান বদলাতে হবে। তবে কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটা কিছু তো করতেই হবে। আমরা বিষয়টি ভেবে দেখছি। ’ পিএসসি পিছিয়ে পড়ছে কি না জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন ‘স্বচ্ছতা, সততা ও দ্রুততার সঙ্গে পিএসসির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সর্বোচ্চ মেধাবীদের নিয়োগ দিতে সক্ষম হচ্ছি। পরীক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে প্রতি বছর একটি করে বিসিএস শেষ করা হচ্ছে। ’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিএসসি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভার্চুয়াল ভাইভাতে যাওয়া ছাড়া পিএসসির কোনো উপায় নেই। পিএসসিতে ক্যাডার পদের ভাইভার জন্য কমিশনের একজন সদস্যের নেতৃত্বে বোর্ড হয়। এই বোর্ডে যোগ দেন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। থাকেন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। তাদের সামনে উপস্থিত হন একজন পরীক্ষার্থী। এই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে আর চলা যাবে না। সামনের দিনগুলোতে প্রার্থী বাসায় থেকেই ভাইভাতে অংশ নিতে পারবেন। তা না হলেও তারা পিএসসিতে উপস্থিত হয়ে অন্য রুমে বসে থাকা পরীক্ষকদের মোকাবিলা করতে পারবেন। ‘এই পদ্ধতিতে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো রাস্তা নেই। অনেকগুলো ননক্যাডার পরীক্ষাও আটকে আছে শুধু ভাইভার জন্য’ বলেন পিএসসির এক কর্মকর্তা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাজটি কোনো কঠিন কিছু নয়। পিএসসির পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত একটা বিধিতে সংশোধনী আনতে হবে। মন্ত্রিসভা সেই সংশোধনী অনুমোদন করলে অধিবেশন না বসলে অধ্যাদেশ জারি করা হবে। পরে সংসদ অধিবেশন বসলে বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। এ কাজের জন্য সরকারকে খুব বেগ পোহাতে হবে না। প্রযুক্তির সহায়তা নিলেই এটা সম্ভব। এখন দরকার উদ্যোগ। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ আছে। নানা সমস্যায় জর্জরিত বিচারালয় যদি ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে যেতে পারে পিএসসি পারবে না কেন? যারা বেকার তাদের প্রয়োজন বিচার প্রার্থীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। করোনাভাইরাসের কারণে পিএসসিকে পিছিয়ে পড়লে চলবে না। তাদেরকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। এমনিতেই সরকারি-বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞাপন নেই। গত বছরের চেয়ে এ বছর ৮৭ শতাংশ চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে। একমাত্র এনজিও ছাড়া চাকরির বাজারে ধস নেমেছে। ’ বেকারদের অবস্থা গভীর মমতা নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
গত শুক্রবার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালের এপ্রিলের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিলে অনলাইনে চাকরির সার্কুলারের হার কমেছে ৮৭ শতাংশ। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী বহু মানুষ কর্মহীন ও চাকরিহীন হয়েছেন। একই সঙ্গে কমেছে চাকরির সার্কুলার ও আবেদনের হার।
জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভার্চুয়াল ভাইভার কোনো প্রস্তাব পিএসসি থেকে পাইনি। পেলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’
৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষাটা এখনো হয়নি। ৪০ বা ৩৮তম বিসিএসও আটকে আছে। এই অবস্থায় সরকারের করণীয় কী জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব বলেন, ‘পিএসসি একটি সাংবিধানিক সংস্থা। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে। তারা কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যার মধ্যে পড়লে সরকারের সহায়তা নেয়। তাদের চাহিদার বাইরে গিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোনো কিছু করার নেই। ’
৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা গত এপ্রিল মাসে হওয়ার কথা ছিল। এর আগে এ পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের অনুমোদন পাওয়ার পরও শুধু বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতেই পিএসসি ছয় মাসের বেশি সময় নিয়েছে। প্রায় সাড়ে ৪ লাখ পরীক্ষার্থী এই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিভিন্ন ক্যাডারে ২ হাজার ১৬৬টি শূন্য পদে নিয়োগ দিতে গত বছরের ২৭ নভেম্বর ৪১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কমিশন। ৫ ডিসেম্বর থেকে এ বিসিএসের জন্য আবেদন শুরু হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ প্রার্থী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন।
৪০তম বিসিএসের অর্ধেক বিষয়ের লিখিত পরীক্ষা হয়েছে। বাকি অর্ধেক কবে হবে তা কেউ বলতে পারেননি। এই বিসিএসের আবশ্যিক বিষয়ের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। গত মার্চের প্রথম দিকে এই বিসিএসের ঐচ্ছিক বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। এই বিসিএসে ৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ জন প্রার্থী আবেদন করেন। গত বছরের ২৫ জুলাই প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে মোট ২০ হাজার ২২৭ জন পাস করেন। এই বিসিএসে মোট ১ হাজার ৯০৩ জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা।
চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ বিসিএস হচ্ছে ৩৯তম বিসিএস। প্রিলিমিনারি ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের বাছাই করা হয়। প্রথম দফায় নিয়োগ দেওয়া হয় ৪ হাজার ৭৯২ জনকে। পরে করোনাভাইরাসের জন্য ননক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে আরও ২ হাজার জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে ১০ এপ্রিল ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের আবেদন কার্যক্রম শুরু হয়, শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। ওই বছরের ৩ আগস্ট এই বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়। এতে ৩৭ হাজার ৫৮৩ জন অংশ নেন; পাস করেন ১৩ হাজার ৭৫০ জন। এর মধ্যে সহকারী সার্জন পদে ১৩ হাজার ২১৯ জন ও ৫৩১ জন সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে উত্তীর্ণ হন। পিএসসি ৪ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ করে আরও ৮ হাজার ৩৬০ জনকে বিসিএস উত্তীর্ণ ননক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করে। তাদের মধ্য থেকেই পরে আরও ২ হাজার জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
৪১তম প্রিলিমিনারি পরীক্ষা শুরুর আগেই ৩৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিল পিএসসি। এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে ফল প্রকাশের উদ্যোগ ছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে প্রায় আড়াইশ পদ বাড়ানোর প্রস্তাব করায় শেষ মুহূর্তে এই বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেওয়া হয়। এই বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট। ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা হওয়ার দুই মাসের মধ্যে এর ফল প্রকাশ করা হয়। এ পরীক্ষায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৮ জন আবেদন করেন।
পিএসসি ক্যাডার পদ ছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ননক্যাডার পদে প্রার্থী বাছাই করে। বিভিন্ন বিসিএসের ননক্যাডার পদ ছাড়াও করোনাভাইরাসের কারণে আটকে গেছে ১০টি ননক্যাডার পরীক্ষা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এসব পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। এসব পরীক্ষার মধ্যে অনেকগুলো শুধু ভাইভার জন্য আটকে আছে।