রাজ পূণ্যাহ তৃতীয় দিনে নারী কার্বারীদের বার্ষিক শীর্ষক সম্মেলন

প্রকাশিত: ১০:১৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০২১

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক,খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ -২য় পর্যায় প্রকল্পের স্থানীয় সরকার বিভাগে,ইউএনডিপির অর্থায়নে এবং মং সার্কেল ও তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার আয়োজনে খাগড়াছড়িতে নারী কার্বারীদের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ রোববার(১২ডিসেম্বর)সকাল থেকে জেলা সদরের ঠাকুছড়া এলাকায় রাজ বাড়ির প্রাঙ্গণে এ রাজ পূণ্যাহের শেষ দিনে ছিল নারী কার্বারীদের বার্ষিক শীর্ষক সম্মেলন ।মং সার্কেল ও তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে।আয়োজিত সম্মেলনে মং সার্কেলের মং রাণী উখেংচিং চৌধুরী’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ এমপি বাসন্তি চাকমা।

এ সম্মেলনে নারী কার্বারী ভূমিকা ত্রিপুরা’র সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি বাসন্তি চাকমা বলেন,নারী হেডম্যান -কার্বারীদের বর্তমান অবস্থার কথা আমি আজ উপলব্ধি করতে পেরেছি।তাঁরা প্রত্যেক পাড়ার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।তাদের ভূমিকা অপরিসীম।
তিনি আরো বলেন,বর্তমান সরকার জননেত্রী শেখ হাসিনা নারীদের বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।তিনি নারী পুরুষ সমান অধিকারকে সবসময় গুরুত্ব সহকারে দেখছেন।বর্তমান সরকার নারী বান্ধব সরকার।আজ আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অবদান দেখতে পাচ্ছি।যেকোন কাজের কিংবা দক্ষতার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সাথে তাল মেলাতে সক্ষম।নারীরাই শ্রেষ্ঠত্বের খ্যাতি অর্জনকারী।এই পার্বত্য অঞ্চলে নারী কার্বারী এবং হেডম্যানদের ভূমিকা অপরিসীম।তারা সরকার এবং রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।বর্তমান সরকার খুবই আন্তরিক তাদের প্রতি।আমি তাদের(নারী কার্বারীদের) সম্মানী বা ভাতার ব্যাপারে আলোচনা করবো এবং নারী কার্যালয় স্থাপনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবো।
তিনি সবসময় নারী হেডম্যান- কার্বারীদের সাথে থাকবেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ সময় নারী বক্তারা বলেন, নারী হেডম্যান -কার্বারীরা পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রথাগত শাসন ব্যবস্থার একেবারেই প্রত্যক্ষভাবে কোর্টের দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানের কাজে সাথে নিয়োজিত রয়েছে।নিয়োগ প্রাপ্তির পর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত আমরা সমাজের নানামূখী ভুমিকা,দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে চলেছে।তিন স্তরবিশিষ্ট প্রথাগত শাসন ব্যবস্থায় এরপরের ধাপে রয়েছে হেডম্যান কোর্টের অবস্থান।

এ জেলায়(খাগড়াছড়ি) ১৯৮জন নারী কার্বারী রয়েছে।১৮৯৬০ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার অধীনে থাকাকালীন রাজকার্য
পরিচালনায়রোয়াজা,দেওয়ান,তালুকদার,আহুন,কাইসিং এর মতো নামধারী রাজকর্মচারীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।শত বছরের লালিত এই প্রথাগত ব্যবস্থাপনাকে ১৯০০সালের শাসনবিধি হিসেবে অন্তভূক্ত করা হয়।যা ১৯০০সালের হিলট্র্যাক্ট ম্যানুয়েল নামে আখ্যায়িত করা হয় এবং সেই সাথে শাসন বিধি জারি করা হয়।১৯৮৯সালের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সরকার কর্তৃক অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছে।এটি পার্বত্য জেলার পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর প্রথা,রীতি-নীতি,সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে।

তারা বলেন,রাজ পূণ্যাহ উপলক্ষে এবারের মত প্রথম নারী কার্বারীগণদের নিয়ে বার্ষিক সম্মেলনে আমাদের জীবনমান সংকটের কথা না বললেই নয়।একজন কার্বারী পাড়ার একজন অভিভাবক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের ভুমিকা পালন করতে হয়।যেম পাড়াবাসীর জন্ম-মৃত্যু,বিবাহ,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,কৃষি ইত্যাদির ক্ষেত্রে তথ্য সংরক্ষণ করা শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব ও ভুমিকা পালন করে থাকে।গ্রামীণ বিভিন্ন পূজা-পার্বন,দ্বন্দ্ব,কলহ,বিবাদ সম্পত্তিসহ নানান দায়িত্ব পালন করে থাকে।
তারা আরো বলেন,আমাদের মান্যবর রাজা সাচিং প্রু চৌধুরীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় আজ নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ সম্মেলনে তারা কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করেন,দাবিসমুহ হলো..
১.প্রথাগত শাসন পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে প্রত্যেকটি পাড়ায় ১টি করে পূর্ণাঙ্গ কার্বারী কার্যালয় স্থাপন করা।
২. নারী কার্বারীদের সরকারিভাবে স্বীকৃতি প্রদান তথা ভাতা প্রদান করা।
৩.সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নারী কার্বারীদের সম্পৃত্ত করা।
৪.নারীর ক্ষমতায়নে সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য ১বছর মেয়াদী সচেতনতামূলক বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্ধ রাখা।
৫.গ্রামীণ নারীদের আয়বর্ধনমূলক তথা কর্মমূখী কাজের বরাদ্ধ রাখা।
৬.জেলা পর্যায়ে নারী কার্বারীদের সম্মিলিত উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করার জন্য একটি ভবন বরাদ্ধ করা।
৭.নারীর স্বাস্থ্য উন্নয়নে নিরবিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তিতে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিশেষ সহযোগীতা প্রদানের ব্যবস্থা করা।
পাহাড় প্রথাগত শাসনবস্থায় নারীদের হেডম্যান ও কার্বারী হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। প্রতিবন্ধকতা দূর করে নারী হেডম্যান ও কার্বারীদের চাপমুক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে রং রাজ সাচিং প্রু চৌধুরী, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য শতরুপা চাকমা,গুইমারা উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ঝর্ণা ত্রিপুরা,তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি চামেলী ত্রিপুরা,১৮৫ নং অযোধ্যা মৌজার নারী হেডম্যান জয়া ত্রিপুরা,নারী হেডম্যান হলাপ্রু চৌধুরী, এসআইডি-সিএইচটি,ইউএনডিপি’র ডিস্ট্রিক ফ্যাসিলিটেটর সুভাষ দত্ত চাকমা, জেলা পরিষদের সদস্য ও হেডম্যান হিরন জয় ত্রিপুরা,তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রিপন চাকমা প্রমুখ।এছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন,হেডম্যান এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক স্বদেশ প্রীতি চাকমা,কার্বারী এসোশিয়েশনের সভাপতি রনিক ত্রিপুরা,কার্বারী এসোশিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হেমরঞ্জন চাকমা,খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি জিতেন বড়ুয়া,তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার রিপোর্টিং ও মনিটরিং অফিসার মিহির কান্তি ত্রিপুরা ও নারী কার্বারীরা উপস্থিত ছিলেন।